1. bdsomachar24.news@gmail.com : Mohashin Hossain : Mohashin Hossain
  2. smtrs12@gmail.com : news :

৩৫% কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে, তিন খাতে তীব্র সংকট

  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৫ শতাংশ এখন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও টেক্সটাইল খাত।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম, খেলাপি ঋণ এবং মানহীন কোম্পানির তালিকাভুক্তির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে বাজারের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বড় চাপের মুখে পড়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যমতে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মোট কোম্পানির সংখ্যা ৩৬০টি। এর মধ্যে বর্তমানে ‘জেড’ শ্রেণিতে রয়েছে ১২৫টি কোম্পানি, যা মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় ৩৫ শতাংশ।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘জেড’ শ্রেণির শেয়ারের আধিক্য পুঁজিবাজারকে দুর্বল করে তুলছে। এসব শেয়ার বিনিয়োগযোগ্য নয়, কিন্তু এগুলো ঘিরেই সবচেয়ে বেশি কারসাজি হয়।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের বাজারকে দুর্বল বলা হয় মূলত ‘জেড’ শ্রেণীর শেয়ারের আধিপত্যের কারণে। এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করে সাধারণ মানুষ কোনো রিটার্ন পায় না। অথচ এগুলো নিয়েই বেশি গ্যাম্বলিং হয়। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হতে হবে।

‘জেড’ ক্যাটাগরি কী

লোকসানি, দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকা কিংবা নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোকে ‘জেড’ শ্রেণিতে রাখা হয়। বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি পরপর দুই বছর নগদ লভ্যাংশ না দিলে, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ হলে বা ছয় মাসের বেশি সময় ব্যবসা বা উৎপাদন বন্ধ থাকলে সেটিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে অবনমিত করা হয়।
এ ছাড়া টানা দুই বছর ঋণাত্মক ক্যাশ ফ্লো কিংবা পুঞ্জীভূত লোকসান পরিশোধিত মূলধন ছাড়িয়ে গেলেও কোম্পানিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে নিতে হয়।

এই শ্রেণির শেয়ারে মার্জিন ঋণ সুবিধা পাওয়া যায় না। পাশাপাশি লেনদেন নিষ্পত্তির সময়ও বেশি হয়। ফলে এসব শেয়ারের তারল্য ও চাহিদা কমে যায়।

সবচেয়ে বেশি সংকটে তিন খাত

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও টেক্সটাইল খাত মিলিয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ১১৭টি। এর মধ্যে ৬১টিই এখন ‘জেড’ শ্রেণিতে।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত। এ খাতের ২৩টি কোম্পানির মধ্যে ১৬টিই ‘জেড’ শ্রেণিতে, যা মোট কোম্পানির প্রায় ৭০ শতাংশ। টেক্সটাইল খাতে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৮টি এবং ব্যাংক খাতের ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি ‘জেড’ শ্রেণিতে রয়েছে। দুই খাতেই এই হার প্রায় ৪৭ শতাংশ।

এ ছাড়া প্রকৌশল খাতের ৪২টির মধ্যে ১৪টি, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের ২১টির মধ্যে ১০টি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ২৩টির মধ্যে ৯টি এবং ওষুধ ও রসায়ন খাতের ৩৪টির মধ্যে ৮টি কোম্পানি ‘জেড’ শ্রেণিভুক্ত।

অন্যদিকে পাট খাতের তিনটি কোম্পানির সবগুলোই ‘জেড’ শ্রেণিতে রয়েছে। তবে টেলিকমিউনিকেশন খাতের তিনটি কোম্পানির কোনোটিই ‘জেড’ শ্রেণিতে নেই।

কেন বাড়ছে ‘জেড’ কোম্পানি

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্বল ও অযোগ্য কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। আইপিওর মাধ্যমে এসব কোম্পানি বাজার থেকে শত শত কোটি টাকা তুললেও পরবর্তীতে অনেক কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ করে দেয় বা লোকসানে পড়ে।

একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে বড় ধরনের অনিয়ম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর নামে-বেনামে নেওয়া ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও। টানা দুই বছর লভ্যাংশ দিতে না পারায় চলতি বছর একসঙ্গে ১৩টি ব্যাংক ‘জেড’ শ্রেণিতে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ইউসিবি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও এনআরবিসি ব্যাংক।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে এফএএস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স ও পিপলস লিজিং। মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ ও আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বড় সংকটে পড়ে।

অন্যদিকে টেক্সটাইল খাতের অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে আইপিওতে ভুয়া তথ্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই লোকসানে পড়ে বা বন্ধ হয়ে যায়।

আস্থা সংকটে ব্যাংক খাত

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুনামের উন্নতি হয়নি। ফলে মানুষের আস্থা কমছে। পারফরম্যান্সের দিক থেকেও অল্প কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া অন্যগুলোর অবস্থার উন্নতি হয়নি।

তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও একই চিত্র। কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামগ্রিক উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

চাপের মুখে টেক্সটাইল শিল্প

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কারণে টেক্সটাইল খাতও চাপে রয়েছে। এতে অনেক কারখানা লোকসানে যাচ্ছে বা উৎপাদন বন্ধ করছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কোভিডের পর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ দুই ধরনের চাপই এখন শিল্পকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সব কারখানার সেই সক্ষমতা নেই।

কারসাজির বড় ক্ষেত্র

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘জেড’ শ্রেণির শেয়ার নিয়েই সবচেয়ে বেশি কারসাজি হয়। সাধারণত কম মূলধনের এবং বন্ধ কোম্পানির শেয়ার সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অনেক সময় কোম্পানি আবার চালু হবে এমন গুজব ছড়িয়ে শেয়ারদর বাড়ানো হয়। পরে কারসাজিকারীরা শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

সমাধান কী

বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল ও অকার্যকর কোম্পানিকে বাজার থেকে বাদ দিতে হবে। একই সঙ্গে ভালো ও স্বচ্ছ কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়াতে হবে।

ডিবিএর সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, শুধু লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে কোম্পানিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে পাঠানোর নীতি আরও বাস্তবসম্মত করতে হবে। বর্তমান কাঠামো পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম মনে করেন, মার্জার ও অ্যাকুইজেশন বাড়ানো গেলে সমস্যার কিছু সমাধান হতে পারে।

কী বলছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, যেসব কোম্পানি নিয়মিত এজিএম করে না, লভ্যাংশ দেয় না বা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে স্টক এক্সচেঞ্জ লিস্টিং রেগুলেশন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, লিস্টিং ও ডিলিস্টিং নীতিমালায় পরিবর্তনের বিষয়ে কাজ চলছে। বিনিয়োগকারীদেরও সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Comments are closed.

আরও দেখুন